স্মৃতি

ব্রিজের উপরটা একদমই ফাঁকা। কোনদিন এ ব্রিজটাকে যানবাহনশূন্য দেখিনি বলেই কিনা কি জানি, যানবাহনশূন্য এ ব্রিজটাকে অতি ছোট একখন্ড মরুভূমির মতোই মনে হলো। আর ব্রিজের বামপাশ ঘেষে, ছোট্ট লাউ হাতে, ধীরে হেটে চলা বৃদ্ধ লোকটাকে দূর থেকে মনে হলো ধূধূ মরুভূমির বুকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা অতি প্রাচীন বিষন্ন একটি খেজুর গাছ। বাইক থামালাম খেজুর গাছটার একদমই গা ঘেষে।
..কাকু ভালো আছেন?
চমকে উঠে খুব দ্রুতই অামার দিকে তাকালেন, হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন অারো দ্রুত, কিন্তু খুব ধীরে জিজ্ঞেস করলেন…
..তুমি ভালো আছো??
..জি, ভালো।
..আপনার শরীর কেমন?
আবার হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন।

মিথ্যে কথা বলতে পারাটা খুব সহজ নয়! অারো কঠিন সেটাকে দেহের ভাষায় প্রকাশ করা। অতি কষ্টে কাকু তাই করলেন। আমার চোখের জলটুকু পড়ি পড়ি করেও পড়লোনা। চোখের জল সংগোপনে সামলে নেয়ার এ অদ্ভুত ক্ষমতা আমার ছোটবেলা থেকেই।
..আমাকে চিনেছেন?
মুখে কৃত্রিম হাসি নিয়ে মাথাটা নিচু করে পায়ের স্যান্ডেলে খুব সম্ভব রাস্তার কোনখান থেকে লেগে থাকা পাঁকা কলার ছোট্ট একটা টুকরো, অন্য পা দিয়ে ছাড়াতে লাগলেন। হয়তো আরো দ্রুত ছাড়াতে লাগলেন তাঁর স্মৃতির জট, যার কেথাও কোন বাঁকে আমি দাঁড়িয়ে আছি। বুঝলাম তিনি আমাকে খুঁজে পাচ্ছেন না। কৃত্রিম হাসি হলেও, অতি চেনা এ হাসিটুকু আমার বুকে ঝড় বইয়ে দিলো!

লাল টকটকে তরমুজের ফালি। এতো মজা করে যে তরমুজ খাওয়া যায়, ছেলেটিকে না দেখলে বুঝতামই না। দশ বারো ফিট গ্রাম্য বাজারের রাস্তার ওপারে দাড়িয়ে এ অপূর্ব দৃশ্যটা দেখছি। আমি অতি ছোট, ছেলেটি আমার চেয়েও ছোট। তখনো তার নাম জানিনা। কিন্তু দেখেছি অজস্রবার। হিন্দু পাড়াতে বাড়ি। ছেলেটির বাবার মুখে অতি চেনা হাসি। তিনি সবসময় হাসিমাখা মুখ নিয়েই সম্ভবত থাকেন।
টেবিলের উপরে ফালি ফালি করে তরমুজ কেটে রাখা। দুই প্রকার তরমুজের ফালি। ছোট ফালির দাম এক টাকা, বড় ফালি দুই টাকা। উনি ছেলেটিকে কিনে দিছেন এক টাকার একটা ফালি। ছোট্ট ছেলেটির অতি ছোট্ট হাতে ছোট লাল টকটকে তরমুজের ফালিটি বেশ বড়ই মনে হচ্ছে। কী অপূর্ব দৃশ্য!
ছোট বেলায় তরমুজ সবারই প্রিয় হয়। অামার ছিলো বেশি প্রিয়। অতি বেশি প্রিয় জিনিসগুলোই সাধারনত ভাগ্যচ্যুত হয়। সমস্ত তরমুজের মৌসুমে এক টাকা দামের দুটো, তিনটে বা চারটে ফালি খেতে পেতাম। কিন্তু সেটাও ছিলো একটা বিরাট ব্যাপার। ধারনা ছিলো, দুই টাকা দামের তরমুজের ফালিগুলো বড় লোকের ছেলেদের জন্য এবং দশ টাকা দিয়ে একটা আস্ত তরমুজ কিনতে পারে কেবল বিরাট মাপের জমিদার। ছেলেটির বাবা সেই জমিদারদের একজন। উনাকে মৌসুমে দুটো তিনটে আস্ত তরমুজ কিনতে দেখেছি।

সমস্ত মৌসুমে দুটো বা তিনটে ফালি তরমুজ পেলেও, রাস্তার ওপারে দাড়িয়ে ছেলেদের হাতে টকটকে লাল তরমুজ খাওয়ার দৃশ্যটি আমার অতি প্রিয় ছিলো । প্রায়ই রাস্তার ওপারে দীর্ঘ্যক্ষণ দাড়িয়ে থাকতাম। ছেলেদের তরমুজ খাওয়ার দৃশ্য দেখতাম। খেতে না পারি, কিন্তু ছুঁয়ে দেখতে খুব ইচ্ছে হতো। প্রিয় জিনিসগুলির প্রতি ছোটবেলার আকর্ষণ বড় বেশি তীব্র হয়। পরের বছর আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো হয়ে যাবে, দুটাকার এক ফালি তরমুজ নিশ্চয় খাবো, কোন একদিন আমার বাবাও দশ টাকা দিয়ে আস্ত একটা তরমুজ কিনবেন, স্বপ্ন দেখতাম।
ছেলেটি ভীষন দরদ দিয়ে তরমুজ খাচ্ছে। ছেলেটির বাবা হাসিহাসি মুখ নিয়ে টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা তরমুজ বিক্রেতার সাথে কথা বলছেন আর ছেলের তরমুজ খাওয়া দেখছেন। আমি দেখছি রাস্তার ওপার থেকে। কত ভাগ্যবান হলে প্রায় প্রতিটা হাটের দিনই এক ফালি তরমুজ খাওয়া যায়, ছেলেটির কথা ভাবছি।
মনে হলে কাকু একবার আমাকে আড় চোখে দেখলেন। তারপর রাস্তা পেরিয়ে একেবারে আমার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
.. কিরে কাজল, তোর বাপ কোথায়রে? বেশ কয়েকদিন দেখিনে।
বলেই আমার হাত ধরে হুড়হুড় করে তরমুজের টেবিলের সামনে নিয়ে দাঁড়ালেন।
বিরাট লজ্জ্বা লাগলেও মনে মনে খুব চাচ্ছিলাম উনি যেনো আমাকে এক ফালি তরমুজ কিনে দেন।
.. তোর মা কেমন আছেরে..।
.. জি, ভালো।
..নে, তুইও একটুকরো তরমুজ খা। নে একটা।
দোকানদারকে বললেন আমাকে তরমুজ দিতে। আমি দুই টাকার লাল টকটকে সবচে বড় ফালিটি দেখিয়ে দিলাম।।

কাকুকে মরিচ চাষ করতে দেখতাম। অন্য কিছু ছিলো কিনা জানিনা, কিন্তু মরিচ বিক্রি করেই যে উনি বড় লোক, ছোট বেলাতে সে ধারনা ছিলো। এতো ভালো একজন মানুষ যে অারো বড় লোক হবেন, এবং কালক্রমে যে বিরাট জমিদার হবেন সে প্রার্থনা করতাম এবং মনে মনে খুব বিশ্বাস করতাম। ছোট মানুষের প্রার্থনা বলেই বোধহয় সেটা কবুল হয়নি। দশ বারো বছরের মধ্যেই উনি প্রায় সর্বশান্ত হয়ে গেলেন। অনেকখানি রোগাও হয়ে গেলেন। অর্থনৈতিক কষ্ট বড় কঠিন কষ্ট। তবুও কাকুর মুখে প্রায়ই সেই হাসিটা দেখতে পেতাম। প্রাণহীন, কৃত্রিম হলেও অামার কাছে সে হাসিটা বড় মধুর মনে হতো।
চাকরির টাকা দিয়ে বাইক কেনা হলো না। বাইক কিনলাম ধার দেনা করে। । এখন অল্প পথ হলেও বাইক ছাড়া চলতে পারিনা। কেমন যেনো হয়ে গেছি! মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। অতীতকে অতি সহজে ভুলে যায়। গ্রামে কতদিন যাইনে হিসাব নেই।

কাকুর পাশে যানবাহনহীন শূণ্য ব্রিজটার উপর বাইকে বসা আমাকে বড় বেশি বেমানান মনে হলো। কিন্তু বাইকের উপর থেকে নামা হলো না। স্টার্ট বন্ধ করে দিয়ই কথা বলছি।
.. কাকু আমি কাজল। আপনাদের পাড়ার অমুকের ছেলে।।
.. হ্যা হ্যা চিনছি। তোমার মা কেমন আছেন?
তারপর হাতে ধরা ছোট্ট লাউটা দেখিয়ে বললেন যে, নিজের গাছের লাউ। তিনটে লাউ নিয়ে আসছিলেন। দুটো বিক্রি হয়েছে, কিন্তু বেশি ছোট বলে এটা বিক্রি হলো না। তাছাড়া বাজারে প্রচুর লাউ। মানুষ আজকাল তরকারি তেমন কেনে না। বলেই হাটা শুরু করলেন।
আমার বুকের ঠিক মাঝখানটায় হাহাকার করে উঠলো। চোখের পানি আটকানোর কোন মন্ত্রই কাজে দিলো না।
একই পথে আমিও যাচ্ছিলাম কিন্তু কোনোভাবেই কাকুকে বলতে পারলাম না যে চলুন আমার বাইকে। একবার মনে হলো সামনে গিয়ে বলি, আবার মনে হলো, না। তাকে নিয়ে আমি বাইক চালাতে পারবো না।
কাকু ততক্ষনে বেশ দূরে চলে গেছেন। চেষ্টা করলাম বাইক স্টার্ট দেয়ার। কয়েকবার শুধু ঘড়ঘড় শব্দ হলো, স্টার্ট হলো না। চোখ মুছে অবাক হয়ে বাইকের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। প্রাণ না থাকলেও বাইক কি অনেক কিছুই বুঝতে পারলো! সেও কি বুঝে গেছে, সামনে হেটে যাওয়া দারিদ্রক্লিষ্ট এ লোকটির সামনে দিয়ে বাইক চালিয়ে যাওয়াটা আমার মানাবে না!!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top