বিনিময়

#বিনিময়
#শম্পা_সাহা

-এই জানিস আজ আমি স্কুলের মাঠ থেকে অনেকগুলো গন্ধরাজ তুলে নিয়ে এসেছি।পুরো একবাটি।একটু জল দিয়ে বেডরুমে রেখেছি।উফ্ কি দারুণ গন্ধ ঘর পু্রো ম ম করছে।আচ্ছা, তোদের বাগানের গন্ধরাজ গাছটা আছে?

-আছে

-তাহলে রাখবি তুলে কিছু ফুল জল দিয়ে একটা বাটিতে করে তোর খাটের পাশের টেবিল টাতে?

-রাখবো

-বেশ আমাদের দুজনকে ঘিরেই থাকবে এক ই গন্ধ সারারাত

-বেশ

অজয় অফিস থেকে ফিরে, উঠোনের কোণের গন্ধরাজ গাছ থেকে গুনে গুনে ষোলোটা ফুল পাড়লো।এনে রাখলো বিছানার পাশের টেবিলে।ওর ঘরেও গন্ধরাজ ম ম করতে লাগলো।

মা বললেন,” আদিখ্যেতা”, বৌদি বললেন,”ঢং”, ভাইজি বললো,”মাথা খারাপ”,দাদা বললো,”বুড়ো বয়সে ন‍্যাকামি”!

-এই এ বছর শিউলি ফুটেছে তোদের বাড়ির গাছটাতে?

-হ‍্যাঁ, প্রচুর।

-তুই তো জানিস,শিউলি আমার ফেবারিট।

-হুম্

-সেটা করবি তো?

-আচ্ছা

বাড়ি ফিরে অজয় একরাশ শিউলি কুড়িয়ে রাখে নিজের মাথায় কাছে বালিশের পাশে।মনে হয় অয়ন্তিকাই শুয়ে।

তীব্র মিষ্টি গন্ধটা মনে করিয়ে দেয় অয়ন্তিকা কোথাও যায় নি,ও আছে এই ঘরে,এই বেডরুমে, অজয়ের সঙ্গেই।

সকালেও বালিশের পাশেই থাকে ফুল গুলো।ফেলে না অজয়।

বৌদি রাগে গজগজ করেন,”মরণ,বিয়ে করতে কে বারণ করেছে?”।ভালোই জানে তা সম্ভব নয়

অবিবাহিত দেওর প্রায় পঁয়তাল্লিশ।আশায় দেওর মরলে এতো বড় অফিসার দেওরের উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি তো তার মেয়েরই প্রাপ‍্য।তাই ওই রাক্ষসী যেন কোনোমতেই এ মুখো না হতে পারে।সব আঁটঘাট বাঁধা।বরকেও শেখানো।মাঝে মাঝে ই ঝামেলা করে মনে করিয়ে দেওয়া ওই ডিভোর্সি মেয়েছেলে এ বাড়িতে তোলা যাবে না।পরিবারের একটা মান মর্যাদা আছে তো!

মা মুখ ঝামটা দেন,”ঘর জ্বালানি মেয়েছেলে,এখন নিজের সংসার ভেঙে আমার ছেলের ঘাড়ে চাপতে চাইছে!বেশ‍্যা বেশ‍্যা!তা ছাড়া আবার কি?দেখ টুবাই আমি বেঁচে থাকতে এ হতে দেবোনা কিন্তু!!”

মনে ভয়,এতদিন ছোট ছেলের রোজগার বেশ আয়েস করে ভোগ করা গেছে।বড় ছেলে এক বাড়িতেই আলাদা।

মা ছেলের সংসার।ওই ভিখিরির মেয়েটাকে তখনই ছেলের কাছে ঘেঁষতে দিইনি।বড় ছেলে বিয়ে করে বৌ নিয়ে আলাদা।ছোট ছেলে আবার একে বিয়ে করতে চায়।

না বলিনি, তাহলে তো বেঁকে বসতো যা রাগি ছেলে!এমন কলকাঠি নাড়লাম সাপ ও মরলো,লাঠিও ভাঙলো না।

মেয়ের বাবাকে গিয়ে যা তা বলে এলাম।মেয়েটাকেও।ব‍্যস্ কেল্লাফতে।আমি আমার ছেলেকে তো চিনি।জানতাম ও ওই মেয়ে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না।ছেলের বৌ নিয়ে আমি বাবা ঘর করতে পারবো না।বড় ছেলেকো তো দেখলাম।আর রিস্ক নেবার মধ্যে নেই।

আর বিয়ে ক‍রলে কি এইভাবে ও আমার যত্ন করতো?বড়র মতই হতো।হয়তো বেশিই।যা ভালোবাসা ছিল!সব শেষ করে দিলাম কিন্তু না আবার ফিরে এসেছে।উঃ!

টুবাই বাধ‍্য,কারো অবাধ‍্য হবে না।কারো মনে কষ্ট দেবে না।ও যে আদর্শ ছেলে,আদর্শ ভাই,আদর্শ দাদা।

সব তুতো বোনেরা ভিড় করে ছুটির দিন।ছোড়দার প্রিয় হতে হবে।শিশুপ্রেমী ছোড়দার কাছে নিজের বাচ্চাকে এগিয়ে দেওয়া।

ছোড়দা কাকে বেশি ভালো বাসবে?ব‍্যাচেলর,মোটা মাইনের একা লোক,যা পাওয়া যায়!কে বলতে পারে উইলে আমার বাচ্চাকেই সব দেবে না?চাপা প্রতিযোগিতা এ নিয়ে সব ভাইবোনেদের।

বছর পঁয়তাল্লিশের টুবাই এখনো সিঙ্গেল,তবে বাস্তবে।আসলেতে নয়।আসলেতে একটা অসুখী বিয়ে ছেড়ে অয়ন্তিকা একা একছেলে নিয়ে।না বিয়ের পর ও আর কোনও যোগাযোগ টুবাই মানে অজয়ের সঙ্গে রাখেনি।কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর আগে ফেসবুক ওদের খুঁজে দেয়।

ওরা আজো ফোনে সংসার ক‍রে। ফোনেই সব সমস্যা শোনে, সমাধান করে।অয়ন্তিকার মন খারাপ হলে অজয় ওর প্রিয় গান গেয়ে শোনায়, ওর বকবক শোনে,এক সাথে পূর্ণিমার রাতে চাঁদ দেখে।না গল্প নয়,ঘোর বাস্তব।

প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে, গভীর বিশ্বাস আছে, শরীর ছাড়াও প্রেম হয়।যেমন অজয় অয়ন্তিকা।ওদের মনের বিনিময়টা ওরা দূরভাষেই সারে!

©®

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top