নুটুদার বিশ্বজয়

নুটুদার বিশ্বজয়
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

আমাদের চার মূর্তিমানের মাথা মানে ক্যাপ্টেন হল নুটু দা । নটেশ্বর গাঙ্গুলি । নুটুদার সাথে টেনিদার প্রচুর মিল । দুজনেই কথার সাগর । লম্বা চওড়া সব কথা । প্রতিবাদ করলেই গাট্টা মারবে । তবে অমিলও আছে । নুটুদা চাকরি করে সরকারি দপ্তরে । কবিতা লিখতে ভালোবাসে । একটু বামপন্থী ঘেঁষা । ঠাকুর দেবতা বলতে এক জনের পায়েই নিবেদিত প্রাণ । স্বয়ং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ধ্যান জ্ঞান । বাঙালির সনাতন পোশাক ধুতি – পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য পোশাক কখনো শরীরে তোলে নি । এই হচ্ছে নুটুদা , আমাদের মধ্যমনি ।
সেদিন আড্ডায় পরিমল বলল , সামনেই ২৫শে বৈশাখ । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মদিন । আমরা তো কিছু করতে পারি ।
সঞ্জয় বলল , কী করতে চাস ?
ছোট করে একটা অনুষ্ঠান করতে পারি ।
তোর কি মাথা খারাপ হল ?
কেন ?
এই লক ডাউনের সময় অনুষ্ঠান , মানে সোশ্যাল গ্যাদারিং ?
তাইতো , ভুলেই গেছিলাম লকডাউনের কথা । তাহলে থাক ।
থাকবে কেন ? পান চিবোতে চিবোতে শান্তিনিকেতনী কালো ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নুটুদার প্রবেশ । নিজের চেয়ারে বসতে বসতে আবার বলল , থাকবে কেন ?
সুকুমার বলল , আসলে লকডাউন চলাকালীন সমস্ত রকমের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা সরকারি নির্দেশ ।
পানের পিকটা গিলে নিয়ে নুটুদা বলল , আমরাতো সরকারি আদেশ অমান্য করবো না ।
তাহলে কী ভাবে করবো ?
বসে বসে যে ভাবে এখন কথা বলছি ঠিক সেই ভাবে ।
একটু সাহস সঞ্চয় করে অমি বললাম , আড্ডা মারা আর রবীন্দ্র জয়ন্তী করা কি এক জিনিস ?
ঝাঁজিয়ে উঠলো নুটুদা । ইডিয়ট , বুদ্ধি আর কবে হবে ? আড্ডা বলতে কি বুঝিস ?
শুধু পরনিন্দা আর পরচর্চা ? “একাদেমসের ” নাম শুনেছিস ? আড্ডা মারতেন সক্রেটিস , এরিস্টটল , প্লুটো বিখ্যাত সব দার্শনিকরা । দুটো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া আর চারটে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করলেই বুঝি রবীন্দ্র জয়ন্তী হয়ে যায় ? যত সব সেকেলে ধ্যান ধারণা ।
তাহলে ?
রবীন্দ্রনাথের আদর্শ , ভাবনা , কর্ম কে সামনে রেখে সেই পথ অনুসরণ করে এগিয়ে চলা । নিজেদের চিন্তা শক্তিকে বিকশিত করা । এর জন্য কোনো অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই । লোক ডাকারও প্রয়োজন নেই ।
দেখতে দেখতে এসে গেল ২৫শে বৈশাখ । নুটুদার নির্দেশ মত সকাল এগারোটার মধ্যে আমরা সবাই আড্ডাস্থলে এসে হাজির । প্রচন্ড গরম । ঘেমে নিয়ে এক সা । সুকুমারদের বাড়ির বৈঠক খানার ঘরটা আমাদের আড্ডার কেন্দ্রস্থল । প্রায় মিনিট পনেরো বাদে হন্তদন্ত হয়ে এল নুটুদা । টেবিলের পাশের চেয়ারটা নুটুদার জন্য নির্দিষ্ট । চেয়ারটাকে কেন্দ্র করে আমরা সেমি সার্কেলে বসেছি । সবাই মোটামুটি প্রস্তুত । গান বা কবিতা কিছু একটা করতে বললে যেন করতে পারি । মেঝেতে শতরঞ্চি বিছিয়ে হারমোনিয়াম রাখা হয়েছে । টেবিলের ওপর রবীন্দ্রনাথের ছবি । ফ্রেমে বাঁধানো । সুকুমারের দিদি চন্দনের ফোটা দিয়ে সাজিয়েছে । গলায় রজনীগন্ধার মালা । ধূপদানিতে ধুপ । একটা মিষ্টি মধুর পরিবেশ । আমরা সবাই ধুতি পাঞ্জাবি পড়েছি ।
সাজানো গোছানো ঘর দেখে নুটু দা একরাশ বিরক্তি এনে বলল , তোরা আর সুধরাবি না । সেই বস্তা পচা কনসেপ্ট । ওরে , আমরা ঠাকুর পুজো করছি না , সাহিত্যের দেবতার আরাধনা করছি । আমাদের সমস্ত শিরায় উপশিরায় তাঁর উপস্থিতি অনুভব করবো ।
সুকুমারের দিদি লজ্বা পেয়ে বলল , তাহলে নুটুদা , এগুলো সব সরিয়ে দিই ।
দিলেই খুশি হব । আসলে তিঁনি তো শুধু একদিনের নন । আসছে বছর আবার হবে বলে দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখবো । তিঁনি প্রতি দিনের । এক মূহুর্ত্তের জন্য তাঁকে বিস্মৃত হওয়া মানে পদ স্খলন । কু-চিন্তা গ্রাস করবে আমাদের মনকে । এখন তো রক্তকরবীর মালা গাঁথার সময় ।
মাসিমা কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে এসে বললেন , বাবা নুটু , জল খাবারটা কি এখন দেব ?
কান পর্যন্ত হেসে নুটুদা বলল , সেটাই ভালো । পেট শান্ত থাকলে সব শান্ত । মনটাও বেশ সতেজ , ফুরফুরে থাকে । কাজে গতি আসে ।
মাসিমা প্লেটে খাবার সাজিয়ে দিলেন । লুচি , তরকারি , ফল , মিষ্টি সহযোগে আমরা দিনের সূচনা করলাম । এরপর সুর হলো মূল অনুষ্ঠান ।
আমি বললাম , নুটুদা , আমি কি একটা রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করবো ?
কেন , রবীন্দ্রনাথের কবিতা কেন ? তোর নিজের লেখা কবিতা নয় কেন ?
না , মানে রবীন্দ্র জয়ন্তীতে নিজের লেখা কবিতা বলা কি ভালো দেখাবে ?
ন্যাকামি করিস না । আর কত দিন বালক থাকবি ? সাবালক হতে কি একটু সাধ হয় না ? গুরুদেব কি বলে গেছেন নাকি যে তার জন্মদিন উদযাপন মানে তার গান , আর কবিতার চর্বিত চর্বন । আরে বাবা , যেখানে উনি শেষ করেছেন , সেখান থেকেই তো আমাদের শুরু করতে হবে । উনি দেখুন যে উনার জন্মদিন মানে শুধু একটা বিশেষ দিন নয় , একটা জাতির এগিয়ে চলার শপথ নেওয়ার দিন । সারা বছর ধরেই চলবে তার কর্মকান্ড ।
আমরা কেউ গান লিখতে জানি না । কোনো গান গাওয়া হল না । শুধু নিজেদের লেখা দু-চারটে কবিতা পাঠ করে নুটুদার দিকে করুন ভাবে তাকালাম ।
সবার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে নুটুদা বলা শুরু করলেন ।
কাল সারাটা রাত আমি জেগে কাটিয়েছি । দুচোখের পাতা এক করতে পারি নি ।
সুকুমার বলল , আমিও ঘুমাতে পারি নি । ঝড়ের যা তান্ডব মনে হচ্ছিল সব উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে । তার ওপর লোড শেডিং হয়ে গেল । প্রচন্ড গরমে আর ঘুম আসে নি ।
নুটুদা বিরক্ত হয়ে বলল , কথার মাঝে ম্যালা ফ্যাচ ফ্যাচ করবি না । চুপচাপ বসে যা বলছি তাই শোন ।
আমরা সবাই চুপ । নুটুদা যথারীতি আবার শুরু করলেন ।
রাত তখন দেড়টা , বুঝলি । শুতে যাবার আগে রবীন্দ্র রচনাবলী পড়া আমার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস । পড়ছিলাম ” দেবতার গ্রাস ” কবিতাটা । বার চারেক পড়ে , বইটা টেবিলের ওপরে রেখে গেলাম ঘুমাতে । আচমকা ঝনঝন শব্দে ঘুম গেল ভেঙে । তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম বিছানায় ।
আলোটা জ্বালাতে দেখি ঘর ময় টুকরো কাঁচ ছড়িয়ে । কাঁচ কোথা থেকে এল ? এদিক ওদিক তাকাচ্ছি এমন সময় সরু কাঁপা গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম । আমার নাম ধরে কে যেন ডাকছে । এই রাত্রি বেলায় আমাকে কে ডাকবে ? দরজা খুলতে যাবো আবার শুনতে পেলাম সেই ডাক ।
নুটু , নুটু বলে ঘরের ভেতর থেকে কে যেন ডাকলো । থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম । এবার নজর গেল দেওয়ালে ঝোলানো গুরুদেবের ছবিটা ভেঙে পড়েছে । ভাঙা ফ্রেমের ভেতর থেকে স্বয়ং গুরুদেব আমাকে ডাকছেন । আমি তো অবাক ! তাড়াতাড়ি করে মাটি থেকে তুলে ভাঙা ফ্রেমটা টেবিলের ওপরে রাখলাম । পরিষ্কার দেখলাম ছবির ভেতর থেকে বিশ্বকবি বলছেন ,
হ্যারে নুটু ,তুই আমার কথা রাখবি না ? তোকে যে বলেছিলাম “দেবতার গ্রাস ” কবিতাটা আমি শেষ করতে পারি নি , তুই ওটা শেষ করিস । তুই কি ভুলে গেলি ? আমি যে মরেও শান্তি পাচ্ছি না ।
খুব খারাপ লাগলো ,বুঝলি । গুরুদেবের এই কষ্ট সহ্য করা যায় না । নিজেকে নিজে ধিক্কার দিলাম । স্বয়ং গুরুদেব আমাকে তার অসমাপ্ত কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন । এত আমার পরম সৌভাগ্য । কত জন্মের পুণ্যের ফল । হাত জোড় করে টেবিলে মাথা ঠেকিয়ে বললাম ,আমি এখুনি লিখছি , গুরুদেব । তারপরে ডাইরির পাতা খুলে বসে পড়লাম অসমাপ্ত কবিতাটা সমাপ্ত করতে । কবিতা লেখা যখন শেষ হল , দেখি পুব আকাশে আর এক রবির আগমন ঘটেছে ।
সেই কবিতাটা কোথায় , নুটু ?
তাকিয়ে দেখি সুকুমারের বাবা এসে দাঁড়িয়েছেন ।
নুটুদা ঝোলা ব্যাগের ভেতর থেকে ডাইরিটা বের করে পড়তে শুরু করলো । আমরা সবাই হতবাক । সত্যি , বলে না দিলে বোঝা মুশকিল যে এটা নুটুদার লেখা ।
সুকুমারের বাবা বললেন , ব্রেভো নুটু , ব্রেভো । তোমার লেখা আমি বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিলাম ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top