নব্বই ও শূণ্য দশকের কবিতা

নব্বই ও শূণ্য দশকের বাংলা কবিতা
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
সৌম্য ঘোষ
“””””””””””””””””””””'””””””'””””””””””””””””””””””””
 
নব্বই দশকের বাংলা কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ ছান্দিক কাঠামোর মধ্যে থেকে বিষয় ভিত্তিক কবিতা লেখা, বা বলা যায় ভাবপ্রধান বাংলা কবিতার এক প্রবর্ধন, তা শূন্য দশকে এসে বেশ খানিকটা বদলে যায়। আমরা লক্ষ্য করি লিরিক প্রধান বাংলা কবিতার শরীরে কোথাও একটা অস্বস্তি সূচিত হয়েছে। হয়ত নব্বই দশকের লেখা থেকে নিজেদের আলাদা করার তাগিদ থেকেই এই উত্তর। হয়ত সত্তর দশকের ছায়ায় লালিত বাংলা কবিতার পাঠাভ্যাস থেকে নিজেদের আলাদা করার এক সচেতন প্রচেষ্টা। যেখানে নব্বই দশকের সংকলন করতে গিয়ে সম্পাদক সে দশকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেন প্রেম এর সঙ্গে এটিএম এর অন্ত্যমিল, সেখানে শূন্য দশকের সম্পাদককে ঘাঁটতে হবে নির্মাণের ইতিহাস। যেখানে নব্বই দশকের কবি খুঁজে বেড়িয়েছেন গল্প বলার ছান্দিক দক্ষতা, সেখানে শূন্য দশকের কবি খুঁজেছেন ভাষা প্রকরণ। হয়ত এর পিছনে কাজ করেছে এক গভীর সত্য যে কবিতা আর জনপ্রিয় হয় না। কবি আর চটুল মনোরঞ্জন করবেন না। আর এই কাজে শূন্য দশক অনেকাংশই তাদের শিকড় পেয়েছে আশির দশকের নতুন কবিতা আন্দোলনে। 

শূন্য দশক 
——————-
এই দশক এক সম্পূর্ণ নতুন সামাজিক প্রেক্ষাপটের চিহ্ন বহন করে। বিশ্বায়ন ইত্যাদির প্রভাব ছাড়াও এই দশকের কবিরা সচেতন বাংলা কবিতার বিশ শতকের প্রায় সামগ্রিক প্রবাহের বাইরে যাবার ব্যাপারে। এই দশকের কবিরা জানেন কিভাবে আগের দশক ব্যবস্থা এবং বিশ শতকের সামগ্রিক কবিতামালা তারা জানেন কিভাবে ভাষার সমস্ত প্রচলন এবং প্রচলিত সম্ভাবনা কবিতার হাতে নিঃশেষিত হয়ে গেছে। এরা চেনেন প্রচলিত ভালো কবিতার ধারা। এরা জানেন কিভাবে ভালো কবিতা লিখতে গিয়ে বাংলা কবিতা এক স্থির পুকুরের দিকে চলে গেছে। এমনকি এও জানেন আঙ্গিক নিয়ে বাংলা কবিতা ততটা সচেতন নয় বাংলা কবিতা মূলতঃ ভাব নির্ভর। বাঙালি জাতি গুঢ় তত্ত্ব চায় না, সে চায় নিবিড় গান। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং লালন ফকির তত্ত্বের  কথা বলেছেন গানে। এই অবস্থায় একুশ শতকের কবির সামনে তার “শুদ্ধ পাঠক”- হীনতা এক চ্যালেঞ্জ। যেখানে নব্বই দশক মূলতঃ খুঁজে চলেছিল পাঠক, এমন কি জনপ্রিয় হবার জন্য দেখা গিয়েছিল কবিতা পত্রিকার সঙ্গে শেভিং ক্রিমের শ্যাশে বিনামূল্যে বিতরণ, সেখানে একুশ শতক পরার পর দেখা গেল বা হয়ত কেউ কেউ বুঝলেন কবিতা মনোরঞ্জনের বিষয় নয়। অথবা এমন কিছু ঘটল যা দিয়ে এ দশক নির্মিতির এক নিবিড় খেলার দিকে এগিয়ে গেল যা বাংলার কবিতার পক্ষে নতুন। হয়ত বা এই নতুন বাংলা কবিতার অভিজ্ঞ পাঠকের সামনে খানিকটা aporia বা সংশয়ের উদ্রেক ঘটিয়েছে। 
 
যদি ধরে নিই ভাবপ্রধান বাংলা কবিতা এই দশকের কবিতার প্রস্থানভূমি, তাহলে এই দশকের ভিত্তি ধরে নিতে হবে শব্দ ও ধ্বনি। কিন্তু এই দশকের কবিতা হয়ত এত সহজে কোনও দ্বিমূলকে মেনে নেয় না। এঁরা টেনে আনেন (অনেক সময়) পুরনো দিক এবং তাকে নিজেদের ভাষায় প্রতিষ্ঠা করেন। “অস্থির সময়” এই শব্দবন্ধটি ৭০ দশক থেকে অতি ব্যবহৃত। কিন্তু ২১ শতকের মত দিশাহীন অস্থির সময় মানব জাতির ইতিহাসে খুব কম এসেছে। এই সেই মতাদর্শোত্তর সময়। এই সেই বাজারের সময়। যে বাজার দাম
———————
জানে, মূল্য জানে না। অথচ এই
—————————–
বাজারে কবিতার কোনও জায়গা নেই। সে বিক্রি হয় না। নব্বই দশক যখন নিজেকে বাজারে প্রতিষ্ঠা দিতে ব্যগ্র, তখন শূন্য তার প্রস্তুতি নিচ্ছে হিংস্র এই সময়ের মোকাবিলায় এক চূড়ান্ত অস্বীকারে। এই পরিবর্তিত সময়ে এক নতুন অভিমুখে (কৃষি থেকে শিল্পে) যেতে চাওয়া। কী সেই নতুন সময়?  কবি আর সামাজিক ভাবে কোনও বিরাট দলের নেতা নন বরং তাঁকে অনেক বেশি করে মিশে থাকতে হবে সাধারণ্যে। প্যারোডি নয়, নব্বই এর এক প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে এক সম্পাদক চিহ্নিত করেছিলেন প্রেম এর সঙ্গে এটিএম এর অন্ত্যমিল। সেখান থেকে পশ্চিম বাংলার  কবিতার সরে আসা, তার বাক্স বাজানো জনমোহিনী ছন্দ থেকে বেরিয়ে এক আপাত বিদিশায় যাওয়া এটাই শূন্য দশকের গরিমা। তাদের এক স্থির বিষয় ভিত্তিক কবিতা থেকে মুক্তি। তখন দেখি আমাদের বাংলার বাংলাভাষা তার প্রচলিত অলংকার ছেড়ে এক অন্য ভাষা নির্মিতির দিকে ঝুঁকছে। 
______________________________
লিখেছেন…. অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
চুঁচুড়া। হুগলী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top