ছোটবেলার হালখাতা

ছোটবেলার হালখাতা
অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায় ( বারাকপুর )

আমাদের ছোট বেলায় বাংলা নববর্ষ ছিল বাঙালির অন্যতম উৎসব । সমস্ত দোকানে হালখাতা । তখন অবশ্য হালখাতা মানে জানতাম না । বিকেল হলেই দেখতাম বাবা মায়ের হাত ধরে ছেলে মেয়েরা চলেছে এক দোকান থেকে আর এক দোকানে । বেরিয়ে আসছে মিষ্টির প্যাকেট আর নতুন বছরের ক্যালেন্ডার হাতে ঝুলিয়ে । আমরা তিন ভাই বোন এর থেকে বাদ যেতাম না । আমার কাকা ব্যাসায়ী । বাড়িতে গনেশ পুজো না করে পুজো দিতেন দক্ষিণেশ্বরে । সকাল হবার আগেই খাতা পত্র বগলদাবা করে পৌঁছে যেতেন মন্দিরে । সাথে আমি । পুজোর ডালা নিয়ে দাঁড়াতাম এক বিশাল লম্বা লাইনের পেছনে । আস্তে আস্তে সকাল হত । সূর্যের তাপ বাড়ত । চিড়বিড়িয়ে উঠতো খানিক আগে গঙ্গায় স্নান করা শরীর । রোদে পুড়ে , ঘামে ভিজে জ্যাব জ্যাবে হয়ে প্রায় ঘন্টা তিনেক বাদে সুযোগ আসতো মায়ের সামনে দাঁড়াবার । আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবার উপক্রম । এত কষ্ট সহ্য করার একমাত্র কারন গনেশ হালুইকরের রেঁস্তোরায় মন মাতানো জলখাবার । মন্দির চত্বরের বাইরে সারিবদ্ধ ভাবে খাবারের দোকান । তার মধ্যে একটা গনেশ হালুইকরের । ছেলে গুলোর কি আপ্যায়ন ! ধরে বেঁধে টেবিলে বসিয়ে দিত ।
কাঁচের শোকেসের ওপরে ঝুড়িতে গরম গরম হিঙের কচুরি | পাশে হিং দেওয়া ছোলার ডাল । দারুন ভাব দুজনের । কচুরি বল করতে এলেই হাতা উঁচিয়ে ব্যাট করতে আসে ছোলার ডাল । গন্ধে ম ম করছে ঘরটা । আমি তো কাবু । দে দে প্যেয়ার দে গোছের অবস্থা । ওদিকে শোকেসের ভেতরে গামলায় গলাগলি করে অর্দ্ধেক ডুবে থাকা পান্তুয়া । জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে এক দল ঘিনঘিনে মাছি । তাতে আমার কিছু যায় আসে না । পান্তুয়ার সাথে আমার দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্ব । টস টস করছে রসে । নিজেকে ধরে রাখা খুব কষ্ট । মনে মনে বলি , ওরে , তোদের জন্যই তো আমার এখানে আসা । তিন ঘন্টা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কি এমনি এমনি ? শুধু তোদের জন্য । তোদের পেয়ে সমস্ত দুঃখ কষ্ট ভুলে যাই ।
এতো গেল সকালের অধ্যায় । কাকার দৌলতে দুপুরের খাবারটাও হত নেমন্তন্ন বাড়ির মত । জম্পেশ । এরপর বিকেলে হালখাতা করা । সে সব ছিল সোনায় মোড়া দিন ।
পাঠান , মোগল থেকে শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সকলেই তাদের ভয়াল ছাপ ফেলে গেছে আমাদের ওপর । অন্তত ইতিহাস তো তাই বলে । নেহাত সেই সময় জন্ম হয় নি বলে , চাক্ষুস করি নি । কলেরা , ম্যালেরিয়াও সেই দৌড়ে সামিল ছিল । এখন যেটা চাক্ষুস করছি সেটা হল করোনা নামক এক ভয়ঙ্কর জীবাণু । কোনো কিছুতেই তাকে থামানো যাচ্ছে না । পায়ে পায়ে বিপদ । আনন্দ উৎসব সব মাথায় উঠেছে । এমনিতেই দেশের অর্থনীতির হাল মাচায় ঝোলা লাউয়ের মত ,তার ওপর এইসব উপদ্রব । হাজার অভাবের মধ্যেও একটু আনন্দ করার উপায় নেই ।
সরকারি কর্মচারী হিসাবে এখন আমার কাজের চাপ নেই বললেই চলে । প্রতিদিন অফিসে আসতেও হয় না । সর্বত্রই একটা ভয়ের বাতাবরণ । বলতে নেই মাইনেটা ঠিক ঠাক পেয়ে যাই । অফিসে তার মধ্যেই গল্প গুজব চলছে সরকারি স্বাস্থ্য বিধি মেনে । সেদিন সে রকমই এক আড্ডায় সহকর্মী অতুল নববর্ষের কথা তুলল । বলছিল তার অভিজ্ঞতার কথা । তবে সে সব ভালো নয় । লোক ঠকানো অভিজ্ঞতা । দোকানদারদের বোকা বানিয়ে কি ভাবে সে আর তার ছেলে মিষ্টির প্যাকেট আদায় করতো তার গল্প । গল্প না গুল্প বলতে পারবো না । শুনতে ভালোই লাগে ।
সুযোগ পেয়ে আমিও বলে ফেললাম আমার ছোটবেলার একটা ঘটনা । বাংলা নববর্ষে একা একা হালখাতা করা । তখন পাড়ায় পাড়ায় দর্জির দোকান । আমাদের পাড়ায় ছিল মন্টুদার দোকান । বাহারি নাম , মন্টুস টেলারিং উইন্ডো । সস্তার বাজার । সাধারণ মানুষ তখন অত পোশাক পরিচ্ছদ নিয়ে মাথা ঘামাত না । যা হোক একটা হলেই হল । যে দোকানের রেট কম , ভিড় সেখানে । আমাদরে মন্টুদার দোকানের রেট কম থাকায় সেখানেই সেলাই করাতাম আমার জামা প্যান্ট । নগদ টাকা দিয়ে । যদিও সেই প্যান্ট পড়লে লোকের বুঝতে অসুবিধা হত আমি আসছি না যাচ্ছি । সেই বিখ্যাত মন্টু দা হালখাতা করতো | সেবার আমায় একটা নেমন্তন্ন পত্র দিয়ে বাবারবার যেতে বলে দিল ।
বাড়িতে বললাম , মন্টুদা আমাকে হালখাতায় নেমন্তন্ন করেছে । আমি একাই যাবো ।
মনে মনে বড় হয়ে গেছি গোছের অনুভূতি ।
মা তো ভয়ে আঁতকে উঠলো । বলল , একা যাবি কি ? রাস্তায় কত গাড়ি ঘোড়া জানিস ?
বাবা বলল , ভয়ের কিছু নেই । মন্টুর দোকান তো পাড়াতেই । যাবে , একটা প্যাকেট নিয়ে বাড়ি চলে আসবে ।
যথারীতি হালখাতার দিন সন্ধ্যে বেলায় বেশ একটা ভালো জামা প্যান্ট পড়ে চলে গেলাম মন্টুদার দোকানে । পাড়ায় যার সাথেই দেখা তাকেই আগ বাড়িয়ে বলি , হালখাতা করতে যাচ্ছি ।
মনে দারুন আনন্দ । এই প্রথম একা একা হালখাতা করা । মা তো অবাক হয়ে যাবে । তার ছেলে আর ছোট নেই । বড়ই হয়ে গেল ।
আমাকে দেখে মন্টুদা বলল , আয় বস ।
আমিও বসলাম । আমার মত দু চারজন বসে আছে ।
কাউন্টারের সামনে ভিড় । দলে দলে লোক আসছে একটু বাদে প্যাকেট আর ক্যালেন্ডার নিয়ে চলে যাচ্ছে । আমি চেয়ে চেয়ে দেখছি ।
আধ ঘন্টা হয়ে গেল আমি বসে আছি । মনে মনে ভাবছি এবার হয়তো আমার পালা আসবে । কিন্তু আসছে না । অন্যরা হাসতে হাসতে আসছে , কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলে প্যাকেট নিয়ে বিদায় নিচ্ছে । আমি যখন এসেছিলাম মন্টুদার পেছনের দেওয়াল ঘড়িতে দেখেছিলাম সন্ধ্যে সাত টা । এখন সাড়ে আট টা । আমি বসেই আছি । আর ভালো লাগছে না ।
বাধ্য হয়ে বললাম , মন্টুদা , আমি তাহলে যাই ?
মন্টুদা বলল , আর একটু বসবি না ? বাড়িতে তো কাজ নেই । থাক একটু । এইতো এলি । তোরা থাকলে আমার খুব ভালো লাগে ।
আবার বসে পড়লাম । প্যাকেটের কোনো নাম গন্ধ নেই । রাত নটা বাজলো । প্রচন্ড খিদে পেয়ে গেছে । আর পারছি না । উঠে দাঁড়ালাম । তখন দোকান অনেকটাই ফাঁকা । একজন দুজন আসছে । প্যাকেট নিয়ে চলে যাচ্ছে ।
বললাম , মন্টুদা , আর দেরি হলে মা চিন্তা করবে ।
মন্টুদা একগাল হেসে বলল , ঠিক আছে , যা তাহলে । আবার আসিস ।
প্যাকেট দিল না । মনের দুঃখে খালি হাতে বাড়ি ফিরলাম ।
বাড়ি আসতেই মা তো হৈ হৈ করে উঠলো ।
বলল , কত রাত হয়ে গেছে । খুব চিন্তায় ফেলে দিয়ে ছিলিস ।
ছোট বোন বলল , দাদা , মিষ্টির প্যাকেট কোথায় ?
এতক্ষন দোকানে যা হয়েছে সবটাই বললাম ।
বাবা হো হো করে হেসে বলল , তুই তো কোনো টাকা দিস নি সেইজন্য তোকে প্যাকেট দেয় নি ।
কিসের টাকা ?
বকেয়া টাকা ।
সেটা আবার কি ?
যাদের কাছে মন্টু টাকা পাবে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার জন্যই হালখাতা । এছাড়া , অনেকে টাকা জমা রাখে । পরে কাজ করিয়ে এখন দেওয়া টাকাটা বাদ দিয়ে দেয় । যেহেতু তুই কোনো টাকা দিস নি , মন্টুও তোকে প্যাকেট দেয় নি ।
মা বলল , মন খারাপ করিস না । তোর বাবা গেছিল হালখাতা করতে । এই প্যাকেটগুলো নিয়ে এসেছে । তুই হাত মুখ ধুয়ে বস , তোকে প্লেটে মিষ্টি দিচ্ছি ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top