গুপ্তজীবন

গুপ্তজীবন

সন্তু বি ডি ও অফিসে কাজ করত।কাজের সূত্রে তাকে ঘুরে বেড়াতে হতো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।সন্তু ঝিনুক ঘাটা স্টেশনে ট্রেন ধরত।কোনো কোনোদিন রাত হয়ে যেত।একদিন রাতে স্টেশনে বসে আছে। সামনেই একটা ঠান্ডা সরবতের স্টল। খুব গরম পড়েছে।সন্তু একটা স্প্রাইট কিনে পান করলো। ঠান্ডা সরবত খেয়ে শরীরটা বেশ শীতল হলো। ট্রেনটা লেট করছে।গ্রামে গ্রামে ঘোরার ফলে পরিচিতি একটু বেড়েছে।অনেকে কথাও বলছে। একজন বললো,কি ক্যাশিয়ার বাবু আজ রাত হলো কেন?
—-আর বলবেন না। কাজ সারতে দেরী হয়ে গেলো।

—-বেশি রাত করবেন না। আপনার কাছে তো টাকা পয়সা থাকে। এই জায়গাটা হলো ডাকাতের জায়গা। জামাই মারি আর ঝিনুকঘাটা এই দুটো গ্রামের নাম মনে রাখবেন। বেশ চলি।

সন্তু ভাবছে লোকটা জানে তার কাছে টাকা থাকে অফিসের। অনেক টাকা। ব্যাগটা চেপে ধরলো।তারপর স্টলের দোকানদারের সঙ্গে গল্প করতে লাগলো।

সন্তু বললো, ভাই কখন তুমি বাড়ি যাও?

—-এই ট্রেনটা চলে গেলেই যাব। আপনাকে একা ফেলে যাব না।

গ্রামের দিকে সাধারণত রাতে স্টেশনে লোকজন কম থাকে। দু একজন ঘোরাঘুরি করছে। সন্তু সবাইকে ডাকাত ভাবছে। খুব ভয় লাগছে তার। হঠাৎ একটা লম্বা ষন্ডা গোছের লোক ছুটে এসে ঠান্ডা সরবতের স্টলে বরফের ভেতর কি একটা ঢুকিয়ে রাখলো।তারপর সন্তুর দিকে তাকিয়ে বললো,কে আপনি? অন্ধকারে বসে কেন?

দোকানদার বললো ও আমাদের ক্যাশিয়ার বাবু গো। তুমি তো চেন?
—–ও আপনি। তা এত রাত কেন??
—-ট্রেনটা লেট করছে তাই?

—– বসুন। আমি জলে হাত ধুয়ে আসি। আমি না আসা অবধি নড়বেন না।

সন্তু লোকটার মুখে মদের গন্ধ পেলো। নেশা করেছে বোঝা গেলো। সন্তু থর থর করে কাঁপতে লাগলো।

স্টলকে গ্রামের লোকে দোকান বলে। সন্তু বললো ভাই দোকানদার তোমার দোকানে বরফের ভেতর কি রাখলো?
দোকানদার বললো,যতটুকু দেখলাম তাতে মনে হলো কোনো মেয়েছেলের সোনার গহনা ভরতি কাটা হাত। বরফের ভেতরে রাখলো।কাল কোনো সময়ে এসে নিয়ে যাবে। কোনো বিরোধিতা করলে দোকানও যাবে প্রাণও যাবে। যা খুশি করুক। আমি কিছু বলতে পারি না। ওরা ডাকাত। এ হলো সর্দার। এর নাম কাটা কেষ্ট। কাটাকাটিতে এর জুড়ি মেলা ভার। আজ পর্যন্ত কত লোক যে মেরেছে তার ইয়ত্তা নাই। আপনাকে আগে যে লোকটা সাবধান করে গেলো,সেও এদের দলের লোক।

সন্তুর হার্টফেল হওয়ার মত অবস্থা হলো। স্টলের লোকটা বললো,আপনাকে চেনে তো। আপনার ভয় নেই।

সন্তু ভাবলো অনেক টাকা সঙ্গে আছে। কি জানি কপালে কি আছে?
ট্রেনটা আসছে না। জানতে পারলো সন্তু, আজ ট্রেন তিন ঘন্টা লেটে আসছে।
স্টলের লোকটা বললো,আপনার তো পরের স্টেশনেই নেমে বাড়ি। আপনি মাঠে মাঠে হেঁটে চলে যান।ছয় কিলোমিটার রাস্তা। মাঠে মাঠে গেলে চার কিলোমিটার হবে।

সন্তু বললো,ঠিক বলেছো ভাই। আমি তবে যাই।
লোকটা বললো,খবরদার কাটা কেষ্টকে বলে যাবেন। তা না হলে সব কেড়ে নেবে।

হন হন করে হেঁটে কাটা কেষ্ট এলো। বললো,বাঃ,আপনি তো খুব ভালো লোক। এখনও বসে আছেন?
সন্তু বললো,আপনার সঙ্গে দেখা করে যাবো বলে বসে আছি। ট্রেন অনেক লেটে আসছে।মাঠে মাঠে যাবো।যদি আপনি অভয় দেন।
—-হুঁ, সঙ্গে ব্যাগ আছে। টর্চ আছে দেখছি। আমার তিন ব্যাটারির টর্চটা নিন। আর আপনারটা আমাকে দিন। আমার টর্চে নিল ফোকাস আছে। সবাই চেনে এই আলো। কেউ আটকালে শুধু টর্চ জ্বালবেন। কথা বলবেন না। যান কোনো ভয় নাই আপনার। আমি এই দোকানে দুদিন পরে টর্চ নিয়ে নেব।আপনি আমার টর্চ এই দোকানেই রাখবেন।আমার সম্পর্কে যা শুনেছেন, আর কাউকে এসব কথা বলতে যাবেন না। সমাজে দিনের বেলায় আমার একটা সম্মান আছে।আর সম্মান দিলে সম্মান পাওয়া যায়।

শুনেছি আপনি গরীব লোকের অনেক উপকার করেন। তাই আপনার উপকার আমি করলাম। যান।

সন্তু বললো,আপনাকে নমস্কার জানাই।আমার অনেক উপকার করলেন।তা না হলে আজ বাড়ি যেতে পারতাম না।

কোনোরকমে কথা বলে, সন্তু টর্চ নিয়ে হন হন করে হেঁটে চলে এলো মাঠ পেরিয়ে পুকুর পাড়ে।এবার নির্ভয়ে সে একটু বসেছে এমন সময় হেঁড়ে গলায় একটা লোক বললো, কে রে। ব্যাগ রেখে এখানে বসে পড়লি।
সন্তুর মনে আছে। কথাবলা যাবে না। উত্তরে টর্চ জ্বাললো।টর্চের আলো দেখে ওরা ভয়ে পালালো।বললো,পালা পালা। এত কাটা কেষ্টর লোক।

সন্তু জল করে বীরবিক্রমে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। একটা টর্চের কি মাহাত্ম্য।সন্তু টর্চটা জ্বেলে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দে গান করতে শুরু করলো।

সুদীপ ঘোষাল নন্দনপাড়া খাজুরডিহি পূর্ব বর্ধমান ৭১৩১৫০মেল[email protected]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top